
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি: মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির পর গুরুতর জটিলতায় ভুগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে আরাফা আক্তার (২৭) নামের এক প্রসূতির। গত বুধবার সকাল ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) তার মৃত্যু হয়। নিহত আরাফা আক্তার মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার গনকপাড়া এলাকার প্রবাসী মোঃ মেহেদি হাসানের স্ত্রী।
পরিবারের অভিযোগ, মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের চরম অবহেলা এবং অব্যবস্থাপনার কারণেই আরাফার মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর থেকে হাসপাতালের সিনিয়র নার্স রাবেয়া আক্তার ও দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. প্লাবনী তালুকদার ছুটির নামে পলাতক রয়েছেন বলেও জানা গেছে।
ঘটনার বিবরণ
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ আগস্ট মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালের একজন স্টাফ রুবির পরামর্শে আরাফাকে ডেলিভারির জন্য জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে লেবার রুমে নেওয়া হয় এবং সিনিয়র নার্স রাবেয়া আক্তার নরমাল ডেলিভারি করান।
তবে অভিযোগ রয়েছে, ডেলিভারির সময় জরায়ু ও নাভীর নাড়ি (ইনটারনাল টিস্যু) কেটে ফেলা হয়, যার ফলে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরিবার বারবার ঢাকা মেডিকেলে রেফার করার অনুরোধ জানালেও তা উপেক্ষা করে মুন্সিগঞ্জেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তিন থেকে চার ঘণ্টা দেরি করা হয়।
পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় পরে ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়। পথে রোগীর রক্তের চাপ অত্যন্ত নিচে নেমে যায় এবং একাধিকবার রক্ত পুশ করতে হয়। ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছানোর পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং সেখানেই মৃত্যু ঘটে।
ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা জানান, আরাফার শরীরে ইন্টারনাল ইনজুরি থাকায় রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালের গাইনী বিভাগের চিকিৎসক ডা. সুমনা ইয়াসমিন বলেন, “ডেলিভারির পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ দেখে আমরা ওটি রুমে নিয়ে যাই এবং তিনজন চিকিৎসক মিলে কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করি। পরবর্তীতে কনডম ব্যান্ডেজ করে রক্তক্ষরণ থামানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু লজিস্টিক সাপোর্ট ও কনসালট্যান্ট না থাকায় আমরা ঢাকায় রেফার করি।”
নার্স সুপারিনটেনডেন্ট আল্পনা মন্ডল বলেন, “ডেলিভারির সময় ভ্যাজাইনালে টিয়ার হয়, যার কারণে শুরুতে অল্প রক্তক্ষরণ হলেও পরে তা বৃদ্ধি পায়। ডাক্তারদের ডাকা হলে তারা ওটিতে নিয়ে যান।”
তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহমেদ কবীর বলেন, “নরমাল ডেলিভারি সাধারণত নার্সরাই করে থাকেন। ডাক্তারদের প্রয়োজন পড়ে না। এই ঘটনায় কোনো অবহেলা ছিল না বলে আমাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।”
অভিযোগ ও দাবি
আরাফার স্বজনরা বলেন, “আমাদের মেয়েটিকে বাঁচানো যেতো, যদি শুরুতেই উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া হতো বা দ্রুত রেফার করা হতো। দেরির কারণে আমরা তাকে হারালাম। একটি শিশু জন্মের আগেই মাকে হারাল।”
তারা আরও বলেন, “আমাদের দাবি, মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালে গাইনী বিভাগে যেন ২৪ ঘণ্টা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। যাতে করে আর কোনো মা এভাবে প্রাণ না হারান।”
গভীর উদ্বেগ ও তদন্ত দাবি
এই ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন এলাকাবাসী। পরিবারটি দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।