নিজস্ব প্রতিবেদক: সুস্থ ও কর্মক্ষম প্রজন্ম গড়ে তুলতে ভিটামিনসমৃদ্ধ নিরাপদ ভোজ্যতেলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ড্রামে খোলা তেল বিক্রি, অস্বচ্ছ প্যাকেজিং ও ভিটামিন ‘ডি’ সংযোজনের অভাব জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
রাজধানীর বিএমএ ভবনে অনুষ্ঠিত “সবার জন্য ভিটামিন সমৃদ্ধ নিরাপদ ভোজ্যতেল: অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়” শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালায় এসব কথা বলেন বক্তারা। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ যৌথভাবে কর্মশালাটি আয়োজন করে। এতে প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার ২৩ জন সাংবাদিক অংশ নেন।
কর্মশালায় জানানো হয়, খোলা ড্রামে তেল বিক্রি সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অব্যাহত রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ (২০১১-১২) অনুযায়ী, দেশে প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজন ভিটামিন ‘এ’ এবং দুইজন ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতিতে ভুগছে। আইন অনুযায়ী ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সংযোজন বাধ্যতামূলক হলেও বাজারে অধিকাংশ তেলে তা অনুপস্থিত বা মানদণ্ডের নিচে পাওয়া যায়।
আইসিডিডিআর,বি-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া ৬৫ শতাংশ তেল খোলা ড্রামে বিক্রি হয়, যার মধ্যে ৫৯ শতাংশে ভিটামিন ‘এ’ একেবারেই নেই এবং মাত্র ৭ শতাংশ তেলে আইনি মানমাত্রার ভিটামিন পাওয়া গেছে। বক্তারা জানান, এসব ড্রাম অনেক সময় কেমিক্যাল, মবিল বা অন্যান্য শিল্পপণ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়—যা খাদ্য উপযোগী নয় এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
বক্তারা আরও বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২২ সালের জুলাই থেকে খোলা সয়াবিন তেল এবং ডিসেম্বর থেকে খোলা পাম তেল বিক্রি বন্ধ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা এখনো কার্যকর হয়নি। এ অবস্থায় নিরাপদ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল নিশ্চিত করতে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদারকি বাড়ানোর আহ্বান জানান তাঁরা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি শিশুদের অন্ধত্ব ও মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়, আর ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবে রিকেটস, হাড়ক্ষয় ও হৃদরোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাই ভোজ্যতেলে ‘এ’ ও ‘ডি’ উভয় ভিটামিন সংযোজন একটি সহজলভ্য ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হতে পারে।
কর্মশালায় আলো প্রতিরোধী ও অস্বচ্ছ বোতলে তেল সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, কারণ সূর্যালোকের সংস্পর্শে ভিটামিন ‘এ’ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তেলের গুণগত মান হ্রাস পায়। বক্তারা বলেন, গুণগতমানসম্পন্ন তেল পুষ্টি সরবরাহের পাশাপাশি স্বাস্থ্যের সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।
কর্মশালায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন—
ফকির মুহাম্মদ মুনাওয়ার হোসেন, সাবেক পরিচালক (উপসচিব), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর;
মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখার, কনসালটেন্ট, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন;
ড. আশেক মাহফুজ, পোর্টফোলিও লিড, গেইন;
দৌলত আক্তার মালা, সভাপতি, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও বিশেষ প্রতিবেদক, দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস;
এবং এবিএম জুবায়ের, নির্বাহী পরিচালক, প্রজ্ঞা।
বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম অফিসার ডা. আলিভা হক এবং প্রজ্ঞা’র কর্মসূচি প্রধান হাসান শাহরিয়ার।