নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন এম. এ. হান্নান

নিজস্ব প্রতিবেদক: ৫ই আগস্ট ২০২৪ সালের পর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী এম. এ. হান্নান নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। দলীয় সূত্র ও এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিএনপির উপজেলা সভাপতির পদকে ব্যবহার করে একাধিক অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলেছেন। নিচে তার কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরা হলো— ১️. “চাঁদাভাই” নামে পরিচিতি ও চাঁদাবাহিনী গঠন:
৫ই আগস্টের পর থেকে এম. এ. হান্নান দল থেকে বহিষ্কৃত ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি চাঁদাবাহিনী গঠন করেন এবং এলাকায় “চাঁদাভাই” নামে পরিচিতি পান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে আসছেন।
২️. অবৈধ মাটিকাটা ও বালু উত্তোলন: ব্যক্তিগত লাভের আশায় ফসলি জমি থেকে এক্সক্যাভেটর মেশিনে মাটি কেটে বিক্রি করেন। স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই ড্রেজার দিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে।
৩️. গরুর বাজারের ইজারা গ্রহণ: উপজেলা সভাপতির প্রভাব খাটিয়ে গত ঈদুল আজহার আগে নিজ নামেই উপজেলা সদর গরুর বাজারের ইজারা নেন। এ ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
৪️. ইটভাটা থেকে মাসোহারা ও বিনামূল্যে ইট গ্রহণ: অভিযোগ আছে, উপজেলার প্রায় সব ইটভাটা থেকেই তিনি মাসিক মাসোহারা নেন এবং নিজের ভবন নির্মাণে বিনামূল্যে ইট ব্যবহার করেন। এসব বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
৫️. সরকারি ঠিকাদারি ও খাসপুকুর ভাগবাটোয়ারা: বিভিন্ন সরকারি হাটবাজার, খাসপুকুর ও জলাশয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিজের লোকদের মধ্যে ভাগ করে দেন এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হন বলে জানা গেছে।
৬️. অবৈধ আয়ে বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয়: ৫ই আগস্টের পর অপকর্মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে প্রায় অর্ধকোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় করেন। এ নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনন্দোৎসব করে স্ট্যাটাসও দেন।
৭️. ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী: দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন।
৮️. আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে সখ্যতা: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ঢাকায় ৩১ দফা বাস্তবায়ন সভায় আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ প্রাক্তন সচিব মফিজ আহমদের (ফরিদ) অর্থায়নে এম. এ. হান্নান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
৯️. আওয়ামী প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা: গত “আমি-ডামি” সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ফরহাদ হোসেন সংগ্রামের পক্ষে প্রচারণা চালান এম. এ. হান্নান। এমনকি তিনি সংগ্রামের কর্মীদের ফোনে উৎসাহ দিয়ে বলেন, “সংগ্রাম এমপি জিতলে নাসিরনগর কলেজ মোড়ে গরু জবাই করে খাওয়াবো।” উক্ত অডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
১০. বাস ও সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি: নাসিরনগর সদর বাস ও সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে তার বাহিনী নিয়মিত চাঁদা আদায় করে থাকে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।
১১️. দলের নেতার ভূমি দখল ও পাসপোর্ট আটক: উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও কৃষক দলের আহ্বায়ক আমিরুল হোসেন চকদারের প্রায় ৭৯ শতাংশ ভূমি (মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা) জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন এম. এ. হান্নান। এছাড়া, একটি ট্র্যাভেল এজেন্সিতে আমিরুল হোসেনের পাসপোর্টও তিনি আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ: দলীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, এম. এ. হান্নানের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা মনে করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে এমন বিতর্কিত, দুর্নীতিবাজ ও অনৈতিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া বিএনপির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এ বিষয়ে এম. এ. হান্নানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
