ট্রাম্পের কৌশলেই এখন চাপে ওয়াশিংটন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরাননীতি এখন তার জন্যই বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরুতে দ্রুত সমাধানের আশা দেখানো হলেও দীর্ঘায়িত সংঘাত এখন ওয়াশিংটনের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যে সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তা এখন প্রায় ১০ সপ্তাহে পৌঁছেছে। কিন্তু এখনো স্পষ্ট কোনো সমাধান কিংবা যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার কার্যকর কৌশল দেখাতে পারেননি ট্রাম্প।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ট্রাম্প মূলত দুই দিক থেকে চাপের মুখে পড়েছেন—একদিকে আন্তর্জাতিক কৌশলগত বাস্তবতা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের প্রভাব এবং তেহরানের অনমনীয় অবস্থান মার্কিন প্রশাসনের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও অসন্তোষ বাড়ছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, যুদ্ধবিরোধী জনমত এবং জনপ্রিয়তায় পতন—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ফলে ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে শান্তি আলোচনার আশাবাদী বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে হঠাৎ হঠাৎ সামরিক পরিকল্পনা পরিবর্তনের পথেও হাঁটছে।

বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। এই উদ্যোগ সফল হলে যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি আগামী এক মাসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সমাধানের রূপরেখা তৈরি হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক দশকের বৈরিতা, পারমাণবিক ইস্যু, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের মতো জটিল বিষয় সহজ কোনো সমঝোতায় নিষ্পত্তি হওয়া কঠিন।

সূত্রগুলো বলছে, ইরান এখন তাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তবুও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান সামনে আসেনি।

এদিকে ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। একদিকে অভিযান শেষের ঘোষণা, অন্যদিকে নতুন সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত—এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি একটি সামরিক অভিযান সমাপ্তির কথা জানালেও কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন আরেকটি উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু সেটিও পরে স্থগিত হয়ে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের তথাকথিত “এক ধাক্কায় সমাধান” কৌশল এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হুমকি, সামরিক হামলা কিংবা নৌ অবরোধ—কোনোটিই তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারেনি।

বরং ইরান তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভেতরেও বড় ধরনের কোনো দুর্বলতার ইঙ্গিত এখনো দেখা যায়নি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ববাজারেও চাপ সৃষ্টি করছে। তেলের সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায় অর্থনৈতিক ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ইয়ান লেসার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী হলেও কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল পাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুদ্ধ শেষ হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সহজ হবে না। কারণ ইরান এখনো তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের ইঙ্গিত দেয়নি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে অনড় রয়েছে।

সব মিলিয়ে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না এলে মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

Spread the love

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *